চর্যাপদের ভাষা, ছন্দ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক: 'আলো-আঁধারি ভাষা' কেন বলা হয়?
চর্যাপদ আবিষ্কারের পর থেকেই এর ভাষা নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক চলে আসছে। একদিকে এটি বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন বলে স্বীকৃত, অন্যদিকে এর ভাষার ধরন এতটাই রহস্যময় যে খোদ আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নিজেই একে এক অদ্ভুত নামে অভিহিত করেছিলেন। এই ব্লগে আমরা চর্যাপদের ভাষা, এর ছন্দ এবং এই নিয়ে বিভিন্ন পণ্ডিতের মতামত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব—যা পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
১. হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দৃষ্টিতে 'আলো-আঁধারি ভাষা'
চর্যাপদের ভাষা সম্পর্কে সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রায়ই পরীক্ষায় আসা মন্তব্যটি করেছিলেন স্বয়ং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি এই ভাষাকে 'আলো-আঁধারি ভাষা' বা 'সন্ধ্যা ভাষা' বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ভাষার কিছু অংশ সহজেই বোঝা যায় (আলো), আবার কিছু অংশ অন্ধকার বা অস্পষ্ট থেকে যায় (আঁধার), যা সাধারণ পাঠকের কাছে বোধগম্য নয়। এই দ্বৈত প্রকৃতিই চর্যাপদের ভাষাকে এতটা রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
২. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত: পশ্চিমবঙ্গের উপভাষা
ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে চর্যাপদের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণাগ্রন্থ The Origin and Development of the Bengali Language (সংক্ষেপে ODBL)-এ তিনি চর্যাপদের ভাষাকে মূলত প্রাচীন বাংলা তথা **পশ্চিমবঙ্গের উপভাষা** (বা রাঢ়ী উপভাষা) বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
তবে এখানেই শেষ নয়—অন্যান্য গবেষকদের মতামত এর থেকে ভিন্ন:
-ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মনে করেন, চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা তথা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বঙ্গ ও কামরূপ) ভাষার কাছাকাছি।
- সুকুমার সেন চর্যাপদের ভাষাকে অভিন্ন বাংলা ভাষার প্রাথমিক রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পরীক্ষায় এই তিনজন গবেষকের নাম ও তাঁদের নির্দিষ্ট মতামত গুলিয়ে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল, তাই প্রতিটি নামের সাথে তাঁর নির্দিষ্ট অভিমতটি জুড়ে মনে রাখা জরুরি।
৩. ধর্মতত্ত্ব নিয়ে প্রথম আলোচনা: শহীদুল্লাহ্-র অবদান
চর্যাপদের ভাষা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত ধর্মতত্ত্ব নিয়েও গবেষণা হয়েছে ব্যাপকভাবে। চর্যাপদের ধর্মতত্ত্ব ও সান্ধ্যভাষার অন্তর্নিহিত গূঢ় সাধনার তত্ত্ব নিয়ে প্রথম বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ১৯২৭ সালে তাঁর রচিত বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ Les Chants Mystiques de Kanha et de Saraha-তে তিনি চর্যাপদের ধর্মমত ও এর সহজিয়া বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভাষাতত্ত্বের গবেষণা (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ১৯২৬) এবং ধর্মতত্ত্বের গবেষণা (শহীদুল্লাহ্, ১৯২৭/১৯২৮)—এই দুটি প্রায় কাছাকাছি সময়ে হলেও সম্পূর্ণ আলাদা দুই দিক নিয়ে কাজ।
৪. চর্যাপদের ছন্দ: মাত্রাবৃত্তের প্রাধান্য
বাংলা সাহিত্যের এই প্রাচীনতম পদাবলী আধুনিক ছন্দের বিচারে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত বলে গণ্য করা হয়। তবে এর প্রাচীন রূপের নিজস্ব পরিভাষাও আছে—অপভ্রংশ ও প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের বিচারে এটি প্রধানত পদ্ধটিকা বা পাদাকুলক ছন্দে রচিত, যেখানে প্রতি চরণে ১৬টি মাত্রা থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, চর্যাপদের পদগুলো নিছক লিখিত কবিতা ছিল না—এগুলো নির্দিষ্ট রাগ-রাগিণী (যেমন পটমঞ্জরী, মল্লার, ভৈরবী) ও তালে গাওয়ার উপযোগী সংগীত ছিল। অর্থাৎ চর্যাপদ ছিল একইসাথে কাব্য ও সংগীতের এক অনন্য মেলবন্ধন।
৫. কেন এই ভাষাগত বিতর্ক এত গুরুত্বপূর্ণ?
চর্যাপদের ভাষা নিয়ে এই বিতর্কগুলো নিছক তাত্ত্বিক কচকচানি নয়—এর মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শহীদুল্লাহ্, সুকুমার সেন, শশীভূষণ দাশগুপ্ত ও প্রবোধচন্দ্র বাগচীর মতো একাধিক গবেষকের সম্মিলিত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আজ আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে চর্যাপদ প্রাচীন বাংলা ভাষাতেই রচিত।
শেষ কথা
চর্যাপদের ভাষা ও ছন্দ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোতে ভালো করতে হলে প্রতিটি গবেষকের নাম, তাঁর গ্রন্থের নাম এবং তাঁর নির্দিষ্ট অভিমত—এই তিনটি তথ্য একসাথে যুক্ত করে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিচ্ছিন্নভাবে মুখস্থ করলে পরীক্ষার হলে গুলিয়ে ফেলার আশঙ্কা থেকে যায়।